বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর ‘শেষ ষোলো’র লড়াইয়ে এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটেছে। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে তাদের বিদায় ঘণ্টা বাজিয়েছে নরওয়ে। এই হার কেবল ব্রাজিলের খেলোয়াড়দেরই নয়, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি ব্রাজিল ভক্তের মনেও এনেছে গভীর হতাশা। আর সেই হতাশার সঙ্গে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার কুমারখালীর এক তরুণ সমর্থক। এই মর্মান্তিক ঘটনা দেশজুড়ে নাড়া দিয়েছে, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বইছে শোক ও আলোচনার ঝড়।
সোমবার (৬ জুলাই) বেলা ১১টার দিকে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের ঘোড়াইঘাট এলাকায় এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। নিহত তরুণের নাম রতন (২১), যিনি ছিলেন পেশায় একজন শ্রমিক। তিনি ওই এলাকার হোসেন মিস্ত্রির ছেলে। পরিবারের দাবি, প্রিয় দল ব্রাজিলের অপ্রত্যাশিত পরাজয় এবং তা নিয়ে বন্ধুদের তীব্র কটাক্ষ সহ্য করতে না পেরেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন রতন। পরাজয়ের কষ্ট আর অপমানের বোঝা সইতে না পেরে তিনি এমন চরম সিদ্ধান্ত নেন। রতনের অকাল মৃত্যু তার পরিবার ও দুই মাসের শিশু সন্তানকে গভীর শোকসাগরে ভাসিয়ে দিয়ে গেছে। ফুটবলকে ঘিরে উন্মাদনা এবং তার পরিণতিতে এমন একটি জীবনহানি দেশের ফুটবল সংস্কৃতিতে এক নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এই বেদনাদায়ক খবর শুনে মর্মাহত হয়েছেন ছোটপর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা জিয়াউল ফারুক অপূর্ব। তিনিও একজন ব্রাজিল সমর্থক। ঘটনার তীব্রতা উপলব্ধি করে অপূর্ব তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন। নিজের ভক্ত-অনুরাগীদের এবং সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের উদ্দেশে তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, ফুটবল কেবল একটি খেলা, কোনোভাবেই এটি জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না।
অপূর্ব তার সামাজিক মাধ্যম পোস্টে লিখেছেন, “ব্রাজিল হারায় কুষ্টিয়ার একটা ছেলে সু*সাইড করেছে, রেখে গেছে দুই মাসের শিশুসন্তান। এই নিউজটা দেখে ভীষণ কষ্ট পেয়েছি। আপনারা খেলাকে বিনোদন হিসেবে নিন। এখানে হার-জিত থাকবেই। প্রিয় দল জিতলে ভালো লাগবে, হারলে খারাপ লাগবে। তবে সেটা জীবনের থেকে যেন বড় না হয়। কারণ দিনশেষে এটা শুধু একটা খেলা।” অভিনেতার এই বার্তা খেলাধুলার প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রাখার আহ্বান জানাচ্ছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “একটা দল হারলে আবার জিতবে, আজ ট্রফি না পেলে সামনে আবার পাবে। কিন্তু একটা জীবন চলে গেলে সেটি আর ফিরে আসে না।” অপূর্বর এই কথাগুলো জীবনের মূল্য এবং খেলার ক্ষণস্থায়ী ফলাফলের মধ্যে পার্থক্যকে স্পষ্ট করে।
ফুটবল বা যেকোনো খেলার সঙ্গেই সাধারণত ট্রল বা কটাক্ষ জড়িয়ে থাকে। তবে অপূর্ব মনে করেন, এরও একটা সীমা থাকা উচিত। তিনি বলেন, “ট্রল খেলার অংশ। তবে অতিরিক্ত ট্রল, অপমান বা হেয় করাটাও বন্ধ করুন। আপনার কাছে এটা মজা হতে পারে; কিন্তু অন্য কারও জন্য সেটি মানসিকভাবে অনেক কষ্টের কারণ হতে পারে।” অভিনেতার এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সীমা অতিক্রম করা ট্রলিং এবং সাইবার বুলিংয়ের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করেছে।
রতন নামের এই তরুণের আত্মহনন কেবল একটি খেলাকে ঘিরে সংঘটিত এক ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং এটি বাংলাদেশে ফুটবল উন্মাদনার গভীরতা, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব এবং অনলাইন বা অফলাইনে ট্রলিংয়ের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে একটি বড় প্রশ্ন। প্রিয় দলের জয়-পরাজয় জীবনের অংশ, কিন্তু কোনোভাবেই তা জীবনকে শেষ করে দেওয়ার কারণ হতে পারে না – এই সহজ বার্তাটিই হয়তো আজ সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
