স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় ( Swastika Mukherjee )

স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় ( Swastika Mukherjee )

১৯৮০ সালের ১৩ ডিসেম্বর কলকাতার এক সম্ভ্রান্ত ও সংস্কৃতিমনস্ক পরিবারে জন্ম নেন স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়। তাঁর বাবা শন্তু মুখোপাধ্যায় ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র (যিনি তরুণ মজুমদার থেকে শুরু করে সত্যজিৎ রায়ের সিনেমাতেও কাজ করেছেন)। মা গোপা মুখোপাধ্যায় ছিলেন একজন নিপাট গৃহিণী, যিনি পর্দার পেছনের সংসারটিকে আগলে রাখতেন। স্বস্তিকার একমাত্র ছোট বোন অজপা মুখোপাধ্যায়, যিনি বর্তমানে ফ্যাশন ডিজাইনিং এবং কস্টিউম ডিজাইনের সাথে যুক্ত।

কলকাতার এক যৌথ পরিবারে একদম ছিমছামভাবে বড় হয়েছেন স্বস্তিকা। বাবা এত বড় অভিনেতা হওয়া সত্ত্বেও বাড়িতে তারকাদের মতো কোনো জাঁকজমক ছিল না। ছোটবেলায় স্বস্তিকার প্রিয় সিনেমা ছিল ‘চিটঠি চিটঠি ব্যাং ব্যাং’, ‘মেরী পপিনস’ এবং ‘দ্যা সাউন্ড অব মিউজিক’।

 

স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়, Swastika Mukherjee
স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়, Swastika Mukherjee

পড়াশোনা ও রবীন্দ্রনাথের প্রভাব

স্বস্তিকার শিক্ষাজীবন শুরু হয় কলকাতার বিখ্যাত কারমেল স্কুল থেকে। পরবর্তীতে তিনি সেন্ট তেরেসা স্কুল এবং গোখেল মেমোরিয়াল স্কুল থেকেও পড়াশোনা করেন। স্কুলজীবন শেষ করে তিনি ভর্তি হন কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখান থেকে তিনি ইতিহাস বিষয়ে স্নাতক (BA) ডিগ্রী অর্জন করেন।

ইংরেজি মাধ্যমে পড়লেও বাড়িতে বাংলা সংস্কৃতির চর্চা ছিল বাধ্যতামূলক। গরমের ছুটিতে গীতবিতান থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখা ছিল তাঁর মায়ের কড়া নিয়ম। মায়ের সেই অভ্যেস আর মায়ের ছোটবেলার গড়িয়ার এক বয়োবৃদ্ধ মাস্টারমশাইয়ের কাছে বাংলা পড়ার সুবাদেই স্বস্তিকা মাধ্যমিকের বোর্ডে বাংলায় ৮৯ নম্বর পেয়েছিলেন। পরীক্ষায় ‘একটি গ্রীষ্মের মধ্যাহ্ন’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের গান ব্যবহার করে শিক্ষিকাদের চমকে দিয়েছিলেন তিনি। আজীবন তিনি স্বীকার করেছেন, তাঁর ভালো অভিনেত্রী হওয়া এবং জীবনের চরম দুঃসময়ে মানসিক ভারসাম্য ধরে রাখার মূল শক্তি ছিল রবীন্দ্রচেতনা। তবে বাংলা ও ইংরেজিতে তুখোড় হলেও স্বস্তিকা রসিকতা করে নিজেকে পদার্থবিদ্যা (Physics) ও গণিতে (Maths) “ফেল করা ছাত্রী” বলে থাকেন।

 

স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়, Swastika Mukherjee
স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়, Swastika Mukherjee

 

১৮ বছরের ভুল ও বৈবাহিক নরকযন্ত্রণা

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়, ১৯৯৮ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে স্বস্তিকা ভালোবেসে বিয়ে করেন প্রখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সাগর সেনের পুত্র প্রমিত সেনকে। কিন্তু এই বিয়ে তাঁর জীবনে এক চরম অন্ধকার অধ্যায় নিয়ে আসে। অল্প বয়সের সেই সংসারে স্বস্তিকাকে চরম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়।

পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ রূপ নেয় যে, ২০০০ সালে যখন স্বস্তিকা অন্তঃসত্ত্বা (গর্ভবতী), তখন তাঁকে শ্বশুরবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। মাত্র ২০ বছর বয়সে কোলে সদ্যজাত কন্যা সন্তান ‘অন্বেষা’ (জন্ম ২০০০)-কে নিয়ে সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েন তিনি। তিনি প্রমিত সেনের বিরুদ্ধে গার্হস্থ্য হিংসা ও শারীরিক নির্যাতনের মামলা করেন (যা আইনি জটিলতায় পরে নিষ্পত্তি হয়)। এক সাক্ষাৎকারে স্বস্তিকা জানিয়েছিলেন, সেই সময় ডিভোর্সের মামলা লড়ার মতো আর্থিক সামর্থ্যও তাঁর ছিল না। কিন্তু মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি ভেঙে না পড়ে লড়ার সিদ্ধান্ত নেন।

 

স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়, Swastika Mukherjee
স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়, Swastika Mukherjee

 

 ফিনিক্স পাখির মতো ঘুরে দাঁড়ানো ও প্রথম ব্রেক

সিঙ্গেল মাদার হিসেবে মেয়েকে বড় করার জন্য স্বস্তিকার তখন অর্থের প্রয়োজন ছিল। নিজের মানসিক জোর ফিরে পেতে ২০০১ সালে তিনি আনন্দ শঙ্কর সেন্টারে ভর্তি হয়ে তনুশ্রী শঙ্করের কাছে নাচের তালিম নেওয়া শুরু করেন।

ঠিক এই সময়েই তাঁর লুকে মুগ্ধ হয়ে টেলিভিশন পরিচালক দেবংশু সেনগুপ্ত তাঁকে ‘দেবদাসী’ মেগাসিরিয়ালে অভিনয়ের সুযোগ দেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস সামলে, কোলে ছোট বাচ্চা নিয়ে তিনি শুটিং শুরু করেন। এরপর ‘আকাশের নিচে’ এবং ‘প্রতিবিম্ব’-এর মতো মেগা সিরিয়াল দিয়ে তিনি কলকাতার ঘরে ঘরে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। ২০০৩ সালে ঊর্মি চক্রবর্তীর ‘হেমন্তের পাখি’ চলচ্চিত্রে একটি ছোট চরিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর অভিষেক হয়।

 

google news , গুগল নিউজ
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

বাণিজ্যিক ছবির যুগ ও জিতের সাথে প্রেম

নায়িকা হিসেবে স্বস্তিকার প্রথম বড় ব্রেক আসে ২০০৪ সালে, রবি কিনাগী পরিচালিত ‘মাস্তান’ চলচ্চিত্রে। এই ছবিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন তৎকালীন সুপারস্টার জিৎ। ‘মাস্তান’ ব্লকবাস্টার হিট হয় এবং স্বস্তিকা রাতারাতি টলিউডের শীর্ষ নায়িকাদের তালিকায় চলে আসেন।

এই ছবির শুটিং চলাকালীনই জিতের সাথে স্বস্তিকার বাস্তব জীবনের প্রেম নিয়ে টালমাটাল গুঞ্জন শুরু হয়। জিৎ-স্বস্তিকা জুটি দর্শকদের এতটাই প্রিয় ছিল যে তাঁরা একের পর এক হিট ছবি উপহার দেন—‘ক্রান্তি’, ‘পার্টনার’, ‘সব দিয়েছ তোমায়’ এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’। তবে পরবর্তীতে কোয়েল মল্লিকের সাথে জিতের অন-স্ক্রিন জুটি এবং কিছু ব্যক্তিগত দূরত্বের কারণে জিতের সাথে স্বস্তিকার সম্পর্ক ভেঙে যায়, যা নিয়ে সে সময়ে মিডিয়াতে প্রচুর লেখালেখি হয়েছিল।

পরমব্রত এবং ‘আইনি’ বিতর্ক

জিতের সাথে বিচ্ছেদের পর, ২০০৮-২০০৯ সাল নাগাদ ‘ব্রেক ফেল’ সিনেমার শুটিং সেটে স্বস্তিকার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় অভিনেতা-পরিচালক পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের সাথে। এই সম্পর্কটি টলিউডের ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায়, কারণ সেই সময়ে স্বস্তিকা ও প্রমিত সেনের ডিভোর্সের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। ফলে খাতায়-কলমে স্বস্তিকা তখনও বিবাহিত ছিলেন। প্রমিত সেন এই নিয়ে পরমব্রতের বিরুদ্ধে আদালতে মামলাও করেছিলেন। ২০১০ সালে পরমব্রত পড়াশোনার জন্য লন্ডনে চলে গেলে এই সম্পর্কের অবসান ঘটে। এই বিচ্ছেদের ধাক্কা সামলাতে স্বস্তিকা নিজেও কিছুদিনের জন্য লন্ডনে পাড়ি দিয়েছিলেন।

ছকভাঙা অভিনেত্রী ও ‘কদলীবালা’ ম্যাজিক

২০১০ সালের পর স্বস্তিকা বাণিজ্যিক ছবির চেনা ছক থেকে বেরিয়ে অন্য ধারার সিনেমা বেছে নিতে শুরু করেন। ২০১২ সালে অনীক দত্ত পরিচালিত ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ ছবিতে মায়াবী ও চটুল ভূত ‘কদলীবালা’ চরিত্রে তাঁর অভিনয় অনন্য এক মাইলফলক স্পর্শ করে।

এরপর তিনি সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘জাতিস্মর’ (২০১৪) এবং ‘মিশর রহস্য’-এর মতো কালজয়ী ছবিতে কাজ করেন। মৈনাক ভৌমিকের ‘টেক ওয়ান’ (২০১৪) ছবিতে একজন সিঙ্গেল মাদার ও অভিনেত্রীর চরিত্রে তাঁর সাহসী অভিনয় কার্যত তাঁর নিজের জীবনেরই প্রতিফলন ছিল। এ ছাড়াও ‘এবার শবর’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘শাহজাহান রিজেন্সি’, এবং ‘কিয়া অ্যান্ড কসমস’-এর মতো ছবিতে নিজের অভিনয় দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন যে যেকোনো কঠিন চরিত্রকে তিনি একাই টেনে নিয়ে যেতে পারেন।

বলিউড ও ওটিটি দুনিয়া জয়

বাংলা ছবির গণ্ডি পেরিয়ে স্বস্তিকা বলিউডেও নিজের নাম উজ্জ্বল করেছেন। দিবাকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ডিটেকটিভ ব্যোমকেশ বক্সী’ (২০১৫) ছবিতে সুশান্ত সিং রাজপুতের বিপরীতে ‘অঙ্গুরী দেবী’ চরিত্রে তাঁর অভিনয় বলিউডকে চমকে দিয়েছিল। পরবর্তীতে সুশান্তের শেষ ছবি ‘দিল বেচারা’ (২০২০)-তেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন।

ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আসার পর স্বস্তিকার ক্যারিয়ার এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। অ্যামাজন প্রাইমের ‘পাতাল লোক’ (২০২০) সিরিজে ডলি মেহরার চরিত্রে এবং নেটফ্লিক্সের ‘কালা’ (২০২২) সিনেমায় তাঁর অভিনয় আন্তর্জাতিক স্তরে প্রশংসিত হয়। ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত তিনি হইচই, জিফাইভ এবং ওয়ানইন্ডিয়ার মতো ওটিটি প্ল্যাটফর্মে একাধিক হিন্দি ও বাংলা ওয়েব সিরিজে প্রধান চরিত্রে কাজ করে চলেছেন।

স্পষ্টবাদিতা, ফ্যাশন ও বর্তমান জীবন

ব্যক্তিজীবনে স্বস্তিকা কোনো রাখঢাক পছন্দ করেন না। বডি শেমিং, নারীবাদ, কাস্টিং কাউচ কিংবা ইন্ডাস্ট্রির পলিটিক্স—যেকোনো বিষয়ে তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় এবং মিডিয়ার সামনে সোচ্চার। ৪৬ বছর বয়সে এসেও (২০২৬ সালের হিসেবে) তিনি নিজের ফ্যাশন এবং হেয়ারস্টাইল নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে ভালোবাসেন। কখনো শাড়ির সাথে স্নিকার্স, কখনো ক্রপ টপ, আবার কখনো সম্পূর্ণ চুল ছেঁটে (Buzz Cut) তিনি ট্রেন্ড সেট করেছেন।

বর্তমানে তাঁর মেয়ে অন্বেষা কার্ডিফ ইউনিভার্সিটি থেকে পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। মেয়ে এবং নিজের পোষ্য কুকুরদের নিয়ে স্বস্তিকা এখন কলকাতায় নিজের ফ্ল্যাটে স্বাধীনভাবে থাকেন। কোনো গডফাদার ছাড়াই, শুধুমাত্র নিজের অভিনয় প্রতিভা আর ইস্পাতকঠিন মানসিকতা দিয়ে তিনি আজ নিজেকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছেন, যেখানে ‘স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়’ নিজেই একটি ব্র্যান্ড।

এক নজরে স্বস্তিকার সম্পূর্ণ জীবনপঞ্জি (Bio-Data)

  • আসল নাম: স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়
  • ডাকনাম: ভেলো
  • জন্ম তারিখ: ১৩ ডিসেম্বর, ১৯৮০
  • ২০২৬ সালে বয়স: ৪৫ বছর ৭ মাস
  • উচ্চতা: ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি
  • চোখের রঙ: হ্যাজেল (সবুজাভ বাদামী)
  • শিক্ষাগত যোগ্যতা: ইতিহাসে স্নাতক (যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়)
  • পিতা: শন্তু মুখোপাধ্যায় (প্রয়াত অভিনেতা)
  • মাতা: গোপা মুখোপাধ্যায় (প্রয়াত)
  • বোন: অজপা মুখোপাধ্যায় (ডিজাইনার)
  • প্রাক্তন স্বামী: প্রমিত সেন (বিয়ে: ১৯৯৮, বিচ্ছেদ: ২০০০)
  • কন্যা: অন্বেষা সেন (জন্ম: ২০০০)
  • প্রথম সিনেমা: হেমন্তের পাখি (২০০৩)
  • বলিউড ডেবিউ: মুম্বাই কাটিং (২০০৮) / ডিটেকটিভ ব্যোমকেশ বক্সী (২০১৫)
  • উল্লেখযোগ্য হিন্দি কাজ: পাতাল লোক, কালা, ক্রিমিনাল জাস্টিস।

 

স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় ( Swastika Mukherjee ) ফটো গ্যালারি:

 

 

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

    মন্তব্য করুন

    আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।