সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর
সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

অভিনয় গুরুকুলের প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা সুফি ফারুক ইবনে আবুবকরের বক্তব্য

সভ্যতার আদিকাল থেকেই মানুষ গল্প শুনেছে, গল্প বলেছে, নতুন চরিত্র বুনেছে আর অন্যের আনন্দ-বেদনাকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে চেয়েছে। তবে সেই গল্পে সত্য অর্থে প্রাণসঞ্চার করেছে যে শিল্প, তা-ই হলো অভিনয়। গ্রিসের প্রাচীন ট্র্যাজেডি মঞ্চ থেকে শুরু করে ভারতের ঐতিহ্যবাহী নাট্যশাস্ত্র, জাপানের ভাবগম্ভীর নোহ ও রূপময় কাবুকি, চীনের বর্ণিল অপেরা কিংবা ইউরোপের শেক্সপিয়রীয় নাট্যধারা—সবখানেই এই অভিনয়ই গল্পকে বারবার জীবন্ত করে তুলে এনেছে মানুষের সামনে। আর আধুনিককালের স্টানিস্লাভস্কির গভীর মনস্তাত্ত্বিক পদ্ধতি থেকে শুরু করে ‘মেথড অ্যাক্টিং’ পর্যন্ত পৌঁছানোর এই দীর্ঘ পথ আসলে মানুষকে চেনা এবং মানুষের গল্পকে রূপায়িত করারই এক সুদীর্ঘ মানবিক অভিযাত্রা।
আমার কাছে অভিনয়ের আসল শক্তিটাই এখানে। একটি চমৎকার অভিনয় কেবল দর্শককে গল্প শোনায় না, সেই গল্পের ভেতরে তাকে সরাসরি বসিয়ে দেয়। ইতিহাস তো কেবল সাল বা তারিখের শুষ্ক কোনো নথি নয়; ইতিহাস হলো মানুষের ভুল-ভ্রান্তি, সংঘাত, সিদ্ধান্ত আর ভালোবাসার এক সুদীর্ঘ ঘটনাক্রম। একজন অভিনেতা যখন সেই ইতিহাস ও তার চরিত্রকে নিজের কণ্ঠ, শরীর ও চেতনায় ধারণ করেন, তখন বইয়ের পাতার নিথর লেখাগুলো রাতারাতি জীবন্ত অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। সেই ঘটনাক্রম থেকে যুগে যুগে যে গভীর জীবনবোধ ও প্রজ্ঞার (Wisdom) জন্ম হয়েছে, অভিনয় তা নিঃশব্দে আমাদের হৃদয়ে গেঁথে দেয়। তাই অভিনয় কেবল শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার মাধ্যম নয়, অতীত থেকে অর্জিত মানবিক প্রজ্ঞাকে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে পৌঁছে দেওয়ার এক পরম বাহন।
ব্যক্তিগতভাবে আমি অভিনয়ের কোনো অভিনয়ের বোদ্ধা বা অভিনয়শিল্পী নই; স্কুল-কলেজের মঞ্চের বাইরে কখনো ওভাবে অভিনয় করাও হয়নি। তবে সংস্কৃতির একজন অনুরাগী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে একটা বিষয় গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি—আমাদের দেশের তরুণদের মাঝে প্রতিভার কোনো অভাব নেই, অভাব শুধু সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার। আমাদের তরুণদেরকে যদি ইতিহাস, তত্ত্ব, শারীরিক ও কণ্ঠপ্রযুক্তি, চরিত্র নির্মাণ, মঞ্চচর্চা এবং ক্যামেরার আধুনিক ভাষার সঙ্গে সঠিক উপায়ে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যায়, তবে তারা বিশ্বমঞ্চেও অভাবনীয় সাফল্য দেখাতে পারে।
ঠিক এই উপলব্ধি থেকেই ‘অভিনয় গুরুকুল’-এর যাত্রা। আমি চাই, এখানে আমাদের তরুণেরা অভিনয়ের সুপ্রাচীন ইতিহাস ও বিশ্বমানের তত্ত্ব জানার পাশাপাশি হাতে-কলমে আধুনিক অভিনয়-কৌশল শিখবে। ক্লাসিক্যাল থিয়েটার থেকে শুরু করে আধুনিক সিনেমা, টেলিভিশন ও ডিজিটাল মিডিয়ার নতুন রূপ—সবকিছুর পেছনের দর্শন ও ভাষাকে তারা যেন অনুধাবন করতে পারে, তেমনই একটি উন্মুক্ত ও চর্চামুখী প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ গড়ে তোলাই আমাদের মূল লক্ষ্য।
আমি বিশ্বাস করি, শিল্পের প্রতি ভালোবাসা থেকেই একজন শিল্পীর জন্ম হয়, কিন্তু সঠিক শিক্ষা ও পদ্ধতি তাকে প্রস্তুত ও পূর্ণাঙ্গ করে তোলে। তাই অভিনয় গুরুকুলের উদ্দেশ্য স্রেফ কিছু পর্দা বা মঞ্চের মুখ তৈরি করা নয়; বরং এমন একদল সংবেদনশীল তরুণ গড়ে তোলা, যারা অভিনয়ের মাধ্যমে মানুষ, সমাজ, ইতিহাস ও কালপরিক্রমায় অর্জিত প্রজ্ঞাকে অনুধাবন করবে এবং সেই বোঝাপড়াকে সৃষ্টিশীল কাজে রূপ দিতে পারবে।
এর একটি বড় বাস্তব দিকও রয়েছে। আজকের বিশ্বে বিনোদন ও ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রি কেবল শিল্প নয়, বিরাট এক বিশ্বব্যাপী কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র। আমাদের তরুণেরা যদি আন্তর্জাতিক মানের অভিনয়-কৌশল ও প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে পারে, তবে তা শুধু তাদের আত্মপ্রকাশের সুযোগ দেবে না, বরং বৈশ্বিক বিনোদন অঙ্গনে নতুন নতুন পেশাগত দুয়ার খুলে দেবে। বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীরা বিশ্বমঞ্চে ও চলচ্চিত্রে কাজ করে দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনুক—এটি আমার এক গভীর স্বপ্ন।
রাতারাতি কোনো শিল্পের খোলনলচে বদলে দেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়, আমি জানি। তবে প্রতিটি ঐতিহাসিক যাত্রার পেছনে থাকে একটি ছোট্ট শুরুর গল্প। ‘অভিনয় গুরুকুল’ সেই দীর্ঘ পথেরই এক বিনীত পদক্ষেপ—যেখানে অভিনয়কে দেখা ও চর্চা করা হবে মানুষকে জানার, ইতিহাস ও প্রজ্ঞাকে লালন করার, সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার এবং এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণের দরদী ভাষা হিসেবে।
তবে শেষ করার আগে একটি সত্য স্বীকার করতে চাই—আমি হয়তো কেবল এই উদ্যোগের সূচনাটুকু করলাম, কিন্তু একে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া আমার একার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার নিজের কাজের ও আগ্রহের ক্ষেত্রে ব্যাপক বিচিত্রগামীতা রয়েছে—যা আমার একটি বড় দোষ এবং দুর্বলতাও বটে। নানামুখী ভাবনায় মন ছড়িয়ে থাকার কারণে কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে টানা পুরো মনোযোগ ধরে রাখা আমার একটা বড় সীমাবদ্ধতা। তাই কেবল আমাকে দিয়ে এই আয়োজন খুব বেশি দূর এগোবে না।
তাই দেশ-বিদেশের অভিনয়শিল্পী, নাট্যজন ও শিল্প-সংশ্লিষ্ট গুণীজনদের প্রতি আমার সশ্রদ্ধ আহ্বান—আপনারা এই উদ্যোগের সাথে যুক্ত হোন এবং ‘অভিনয় গুরুকুল’-কে নিজেদের প্রতিষ্ঠান ভেবে আপন করে নিন। আপনাদের অভিজ্ঞ হাত ও সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ধরেই এই স্বপ্ন পূর্ণতা পাক এবং কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে যাক।
সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর
প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা,
অভিনয় গুরুকুল