চলচ্চিত্র জগতে ২০ বছর পূর্ণ করেছে বিশাল ভরদ্বাজ পরিচালিত কালজয়ী ছবি ‘ওমকারা’। উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের অমর ট্র্যাজেডি ‘ওথেলো’ অবলম্বনে নির্মিত এই হিন্দি ছবিটি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। মুক্তির দুই দশক পূর্তিতে ছবির অন্যতম প্রধান অভিনেতা সাইফ আলী খান সম্প্রতি দ্য হলিউড রিপোর্টার ইন্ডিয়া এবং ফিল্ম কম্প্যানিয়নকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শুটিংয়ের নানা স্মৃতি এবং রোমাঞ্চকর ঘটনা তুলে ধরেছেন, যা আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে এই শিল্পকর্মকে।
সাইফ আলী খান, যিনি ছবিটিতে জটিল ও আইকনিক চরিত্র ‘ল্যাংড়া ত্যাগী’ রূপে অনবদ্য অভিনয় করে সমালোচকদের ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন, তিনি স্মৃতিকথা বলতে গিয়ে জানান, পরিচালক বিশাল ভরদ্বাজ একসময় তাঁকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে অভিনয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। যদিও শেষ পর্যন্ত সেই ভাবনা বাস্তবে রূপ নেয়নি, সাইফ এখন আক্ষেপ করেন যে তিনি কেন সেই প্রস্তাব মেনে নেননি। তিনি বলেন, “ছবির একটি দৃশ্য ছিল যেখানে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমাকে একটি দীর্ঘ সংলাপ বলতে হতো। বিশালজি হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, ‘নগ্ন হয়ে দৃশ্যটা করতে আপত্তি আছে?’ ভাবনাটা খুবই রোমাঞ্চকর ছিল, কিন্তু সেটে তখন অনেক লোক থাকায় আমি কিছুটা ইতস্তত করেছিলাম। আমি তাঁকে বলেছিলাম, ‘আপনি যদি নিজে আমাকে নগ্ন হয়ে পরিচালনা করেন, তাহলে আমি করব।’ তিনি হাসিমুখে জবাব দিলেন, ‘না, আমি সেটা করব না।’ ঘটনাটা এখন ভাবলে বেশ মজার লাগে।” সাইফ আরও বলেন, এখন যদি এমন প্রস্তাব আসে, তিনি তা লুফে নেবেন, কারণ তাঁর মনে হয়, পেছন দিক থেকে বা সিলুয়েট আকারে শুট করলে দৃশ্যটি দারুণ হতো এবং নতুন কিছু করার চেষ্টায় এটি একটি সাহসী পদক্ষেপ হতে পারত।
শুধু নগ্ন দৃশ্যের প্রস্তাবই নয়, একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যের পরিকল্পনাও শুটিংয়ের ঠিক আগ মুহূর্তে বদলে দিয়েছিলেন বিশাল ভরদ্বাজ। সাইফের ভাষ্যমতে, একটি দৃশ্যে তাঁকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিশোধের কথা সংলাপে বলতে হচ্ছিল। কিন্তু বিশালজি হঠাৎ এসে বলেন, “আমি চাই না তুমি কোনো সংলাপ বলো। আমার একটা নতুন ধারণা এসেছে।” পরিচালকের সেই নতুন পরিকল্পনার বর্ণনা দিতে গিয়ে সাইফ জানান, বিশাল ভরদ্বাজ চেয়েছিলেন তিনি আয়নার সামনে দাঁড়াবেন, আর ক্যামেরা পেছন থেকে এগিয়ে আসবে। তাঁর হাতে একটি ভারী ধাতব বস্তু, যেমন হাতুড়ি, দেওয়া হবে এবং সেটি দিয়ে তিনি আয়না ভেঙে ফেলবেন। আশা করা হয়েছিল, ভাঙা আয়নার টুকরোগুলোয় তাঁর মুখের প্রতিফলন নানা খণ্ডে ভাগ হয়ে যাবে। আঘাতের ফলে হাত কেটে রক্ত বের হবে এবং সেই রক্ত তিনি কপালজুড়ে মেখে নেবেন। এই দৃশ্যটির মাধ্যমেই দর্শক বুঝতে পারবে যে তিনি প্রতিশোধ নিতে প্রস্তুত – কোনো সংলাপের প্রয়োজন নেই। সাইফ মনে করেন, বিশালজির এই সিদ্ধান্ত ছিল কতটা সংযত আর বুদ্ধিদীপ্ত! ওই মুহূর্তেই তিনি বুঝেছিলেন, পরিচালক ঠিকই বলছেন। একটি দৃশ্যের মাধ্যমে পুরো বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব, যা ‘ওমকারা’র অসংখ্য সৃজনশীল মুহূর্তের মধ্যে একটি ছিল।
আরেকটি চমকপ্রদ তথ্য হলো, ‘ল্যাংড়া ত্যাগী’ চরিত্রের জন্য প্রথমে আমির খানের কথা ভাবা হয়েছিল। সাইফ জানান, পরে তিনি বিশাল ভরদ্বাজের কাছেই শুনেছেন যে আমির এই চরিত্রটি নিয়ে অনেক প্রশ্ন করছিলেন এবং কিছু পরিবর্তনও চাইছিলেন। বিশাল আমিরকে পরে জানাবেন বললেও, শেষ পর্যন্ত সাইফকেই ফোন করেন। বিশাল নাকি মনে করেছিলেন, আমির যেভাবে চরিত্রটি দেখতে চাইছিলেন, সে পথে তিনি যেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছিলেন না। সাইফের এই চরিত্রে অভিনয় শুধু তাঁর নিজের ক্যারিয়ারের দিক থেকে নয়, ভারতীয় সিনেমার প্রেক্ষাপটেও একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছিল। তাঁর রোমান্টিক ‘চকোলেট বয়’ ইমেজ ভেঙে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অন্ধকারাচ্ছন্ন চরিত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তিনি।
উত্তর ভারতের গ্রামীণ রাজনৈতিক বাস্তবতার পটভূমিতে নির্মিত ‘ওমকারা’ ছবিটিতে ক্ষমতা, জাতপাত এবং পিতৃতন্ত্রের মতো গভীর বিষয়গুলি অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে উঠে এসেছে। এই ছবিতে ‘ল্যাংড়া ত্যাগী’ চরিত্রে সাইফ আলী খানের অভিনয় আজও তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম সেরা কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়। সমালোচকরা তাঁর অভিনয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং এটি তাঁকে এক ভিন্ন ধারার অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। ‘ওমকারা’ কেবল একটি চলচ্চিত্র নয়, এটি ভারতীয় সিনেমার এক সাহসী নিরীক্ষা এবং গভীর সমাজ বিশ্লেষণের দলিল, যা দুই দশক পরেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও প্রভাবশালী। সম্প্রতি সাইফকে ‘কার্তব্য’ ছবিতে দেখা গেছে, তবে ‘ওমকারা’র স্মৃতিচারণ আবারও প্রমাণ করে, কিছু কাজ সময়ের সীমানা পেরিয়ে যায়।
