বলিউডের অন্যতম সফল ফ্র্যাঞ্চাইজি যশরাজ ফিল্মসের ‘স্পাই ইউনিভার্স’ এবার এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। পুরুষ গুপ্তচরদের একচ্ছত্র আধিপত্যের চিরাচরিত ধারা ভেঙে প্রথমবার দুই নারী গুপ্তচরকে ফ্রন্টফুটে এনেছে এই প্রযোজনা সংস্থা। বহুল প্রতীক্ষিত অ্যাকশন থ্রিলার ছবি ‘আলফা’র মাধ্যমে আলিয়া ভাট এবং শর্বরী দর্শকসমক্ষে হাজির হয়েছেন এক ভিন্ন আঙ্গিকে। এই নারীকেন্দ্রিক স্পাই থ্রিলারটি নিয়ে দর্শকদের মনে উন্মাদনা ছিল তুঙ্গে। ট্রেলার মুক্তির পর থেকেই আলোচনায় ছিল ছবিটির অ্যাকশন ও তারকা সমাবেশ। তবে, মুক্তির প্রথম দিনে বক্স অফিসে প্রত্যাশা পূরণে অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে ছবিটি, যা বলিউডের এই বৃহৎ স্পাই মহাবিশ্বের জন্য একটি মিশ্র ইঙ্গিত বহন করছে।
সমালোচক এবং দর্শকদের কাছ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার মাঝেই ‘আলফা’র প্রথম দিনের বক্স অফিস কালেকশনের বিস্তারিত তথ্য সামনে এসেছে। চলচ্চিত্র বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, এমন বড় তারকাখচিত এবং ফ্র্যাঞ্চাইজির গুরুত্বপূর্ণ একটি ছবির জন্য এই ধরনের ওপেনিং কিছুটা হতাশাজনক।
প্রথম দিনের আয়: প্রত্যাশার চেয়ে কম, তবে আলিয়ার জন্য ইতিবাচক
বক্স অফিস ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ‘স্যাকনিল্ক’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, মুক্তির প্রথম দিনে রাত ১০টা পর্যন্ত ‘আলফা’ ভারতের বাজারে প্রায় ৮.৮১ কোটি টাকা (নেট) ব্যবসা করেছে। সারা দেশে প্রায় ৭,৫৩৪টি শো-তে মুক্তি পাওয়া এই ছবি আলিয়া ভাটের মতো একজন প্রথম সারির অভিনেত্রীর চলচ্চিত্র হিসেবে একটি মোটামুটি ভালো ওপেনিং বলা চলে। তবে যশরাজ ফিল্মসের স্পাই ইউনিভার্সের মাপকাঠিতে এই সংখ্যা অনেকটাই কম।
স্পাই ইউনিভার্সের সর্বনিম্ন ওপেনিং, তবু ‘জিগরা’কে ছাড়িয়ে
ওয়াইআরএফ (YRF) স্পাই ইউনিভার্স ভারতীয় চলচ্চিত্রে একটি নিজস্ব স্থান তৈরি করেছে, যেখানে ‘এক থা টাইগার’, ‘টাইগার জিন্দা হ্যায়’, ‘ওয়ার’ এবং ‘পাঠান’-এর মতো ব্লকবাস্টার ছবিগুলো ব্যাপক সাফল্য লাভ করেছে। এই ফ্র্যাঞ্চাইজির অন্যান্য ছবির তুলনায় ‘আলফা’র প্রথম দিনের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত হৃতিক রোশন এবং টাইগার শ্রফ অভিনীত ‘ওয়ার’ ছবিটি প্রথম দিনে ৫৩.৩৫ কোটি টাকার বাম্পার ওপেনিং পেয়েছিল, যা সমালোচকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া সত্ত্বেও বক্স অফিসে ঝড় তুলেছিল। অন্যদিকে, শাহরুখ খানের ‘পাঠান’ প্রথম দিনে ৫৭ কোটি টাকা আয় করে এই ফ্র্যাঞ্চাইজির সর্বোচ্চ ওপেনিংয়ের রেকর্ড ধরে রেখেছে। সেই তুলনায়, ‘আলফা’ এই ইউনিভার্সের সবচেয়ে কম কালেকশন নিয়ে যাত্রা শুরু করল, যা ফ্র্যাঞ্চাইজির ভবিষ্যৎ নারীকেন্দ্রিক ছবির জন্য একটি পরীক্ষা বলে মনে করছেন অনেকে।
তবে, আলিয়া ভাটের সাম্প্রতিক অন্যান্য ছবির তুলনায় ‘আলফা’ ভালো ফল করেছে। গত বছর মুক্তিপ্রাপ্ত তার শেষ সিনেমা অর্থাৎ ২০২৪ সালের ‘জিগরা’ প্রথম দিনে মাত্র ৪.৫৫ কোটি টাকা আয় করেছিল, যা ‘আলফা’ সহজেই পার করে গিয়েছে। প্রায় দু’বছর পর বড়পর্দায় আলিয়ার প্রত্যাবর্তন হিসেবে এই সংখ্যাটি ব্যক্তিগতভাবে তার জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করছে। এটি প্রমাণ করে যে তার স্টার পাওয়ার এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী, যদিও ফ্র্যাঞ্চাইজির প্রত্যাশা পূরণে আরও অনেকটা পথ বাকি।
কেমন হলো ছবির রিভিউ? হৃতিকের উপস্থিতি ও শর্বরীর উত্থান
শিব রাওয়াল পরিচালিত এই ছবিতে আলিয়া ও শর্বরী ছাড়াও খলনায়কের ভূমিকায় অভিনেতা ববি দেওল এবং গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অনিল কাপুরকে দেখা গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ববি দেওল তার খলনায়ক চরিত্রে দারুণ সফলতা পেয়েছেন, যা এই ছবির কাস্টিংয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে ছবির আসল চমক ছিল হৃতিক রোশনের বিশেষ ক্যামিও উপস্থিতি। ‘ওয়ার’ ফ্র্যাঞ্চাইজির জনপ্রিয় চরিত্র ‘কবীর’ হিসেবে হৃতিকের এন্ট্রি সিনেমা হলে দর্শকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উন্মাদনা তৈরি করেছিল। তার উপস্থিতি ছবির অ্যাকশন দৃশ্যগুলোতে বাড়তি গতি এনে দিয়েছে, যা দর্শকদের মধ্যে বেশ ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।
হিন্দুস্তান টাইমসের রিভিউ অনুযায়ী, ছবিটিকে খুব খারাপ বলা যাবে না, তবে এটি ‘ওয়ার’ বা ‘পাঠান’-এর মতো স্পাই ইউনিভার্সের পূর্ববর্তী ছবিগুলোর পর নতুন কোনো দিশা দেখাতে পারেনি। ছবির চিত্রনাট্য তুলনামূলকভাবে দুর্বল, এবং অনেক সমালোচক এটিকে আবেগহীন বলে মন্তব্য করেছেন। হৃতিকের উপস্থিতি কিছু মুহূর্তকে জমিয়ে দিলেও, সামগ্রিকভাবে ‘আলফা’ নিজস্ব কোনো জোরালো ছন্দ খুঁজে পায়নি। এটি একটি সাহসী প্রচেষ্টা হলেও, গল্প এবং চরিত্র নির্মাণে আরও গভীরতার প্রয়োজন ছিল বলে মনে করা হচ্ছে।
তরুণ অভিনেত্রী শর্বরীর জন্য এই ছবিটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। যশরাজ ফিল্মসের মতো একটি বৃহৎ প্রযোজনা সংস্থার ব্যানারে, আলিয়া ভাটের মতো একজন প্রতিষ্ঠিত তারকার সঙ্গে স্পাই ইউনিভার্সের মতো একটি বড় ফ্র্যাঞ্চাইজিতে কাজ করার সুযোগ তার ক্যারিয়ারের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বিশাল মাইলফলক। তার অভিনয় এবং অ্যাকশন দৃশ্যগুলিতে তার স্বচ্ছন্দ উপস্থিতি দর্শকদের নজর কেড়েছে, যা তাকে ভবিষ্যতের জন্য একজন প্রতিশ্রুতিশীল অ্যাকশন তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করবে।
সামগ্রিকভাবে, ‘আলফা’ বলিউডের স্পাই ইউনিভার্সকে এক নতুন পথে নিয়ে আসার একটি সাহসী পদক্ষেপ। নারী প্রধান এই ছবি বক্স অফিসে কিছুটা মন্থর গতিতে শুরু করলেও, আগামী দিনগুলোতে দর্শক ও সমালোচকদের ইতিবাচক ‘ওয়ার্ড অফ মাউথ’ এর ভাগ্য বদলে দিতে পারে। এখন দেখার পালা, এই দুই নারী গুপ্তচর বক্স অফিসে কতটা সাফল্য অর্জন করতে পারেন এবং স্পাই ইউনিভার্সের ভবিষ্যৎ গতিপথকে কোন দিকে নিয়ে যান।

