চিরঞ্জিত চক্রবর্তী

চিরঞ্জিত চক্রবর্তী

বাঙালি দর্শকের কাছে তিনি একাধারে অ্যাকশন হিরো, আবেগপ্রবণ পারিবারিক চরিত্রের আদর্শ রূপকার, দক্ষ পরিচালক এবং প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন চিত্রনাট্যকার। আশির দশক থেকে শুরু করে নব্বইয়ের দশকের বাংলা বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের একচ্ছত্র অধিপতিদের নাম নিলে যার কথা অবধারিতভাবে চলে আসে, তিনি চিরঞ্জিত চক্রবর্তী। উত্তম কুমার পরবর্তী যুগে বাংলা সিনেমা যখন এক চরম রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন যে কজন অভিনেতা নিজেদের কাঁধে টলিউডকে টেনে নিয়ে গেছেন, তিনি তাদের অন্যতম। কেবল রুপোলি পর্দায় সীমাবদ্ধ না থেকে নাটক, টেলিভিশন, যাত্রা এবং পরবর্তীতে রাজনীতি—সবখানেই তিনি নিজের সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন।

চিরঞ্জিত চক্রবর্তী
চিরঞ্জিত চক্রবর্তী

প্রারম্ভিক জীবন ও পারিবারিক ঐতিহ্য: শিল্পীর রক্তে শিল্পের টান

চিরঞ্জিত চক্রবর্তীর জন্ম সংস্কৃতি ও শিল্পের শহর কলকাতায়। তবে পর্দায় আমরা যাকে ‘চিরঞ্জিত’ নামে চিনি, তাঁর প্রকৃত নাম কিন্তু দীপক চক্রবর্তী। তাঁর শৈল্পিক সত্তার বিকাশ আকস্মিক কোনো ঘটনা ছিল না, বরং তা ছিল বংশানুক্রমিক।

তাঁর পিতা ছিলেন বাংলার প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী ও কার্টুনিস্ট শৈল চক্রবর্তী। পিতার এই শৈল্পিক গুণাবলী দীপকের রক্তে গভীরভাবে মিশে ছিল। ছোটবেলা থেকেই ঘরে রঙ, তুলি, আর স্কেচের যে পরিবেশ তিনি পেয়েছিলেন, তা তাঁর ভিজ্যুয়াল সেন্স বা দৃশ্যপট বোঝার ক্ষমতাকে দারুণভাবে সমৃদ্ধ করেছিল। যা পরবর্তীতে তাঁর চলচ্চিত্র পরিচালনা ও চিত্রনাট্য লেখার ক্ষেত্রে এক বিশাল শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

চিরঞ্জিত চক্রবর্তী
চিরঞ্জিত চক্রবর্তী

শিক্ষার অঙ্গন ও জীবনের মোড় পরিবর্তন: ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে অভিনয়

চিরঞ্জিত তাঁর প্রাথমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন কলকাতার বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিত্র ইনস্টিটিউশন থেকে। স্কুল জীবনের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি তৎকালীন ও বর্তমান সময়ের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কারিগরি বা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার জন্য ভর্তি হন।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিগ্রি মানেই একটি সুরক্ষিত ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। কিন্তু যার মনের ভেতরে অভিনয়ের অদম্য ক্ষুধা আর সৃজনশীলতার আগুন জ্বলছে, তাকে কি আর চার দেয়ালের গাণিতিক সমীকরণ আটকে রাখতে পারে? ফলস্বরূপ, ভেতরের ডাককে উপেক্ষা করতে না পেরে তিনি প্রথাগত শিক্ষা অসম্পূর্ণ রেখেই বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেন। পা রাখেন গ্রুপ থিয়েটার, নাটক ও চলচ্চিত্রের এক অনিশ্চিত কিন্তু রোমাঞ্চকর জগতে। নাম পরিবর্তন করে ধারণ করেন ‘চিরঞ্জিত’, যার অর্থ অমর; আর নিজের কাজের মাধ্যমে টলিউডে তিনি সত্যিই নিজেকে অমর করে তুলেছেন।

চিরঞ্জিত চক্রবর্তী
চিরঞ্জিত চক্রবর্তী

টলিউডে রাজকীয় অভিষেক ও বাণিজ্যিক ছবির সোনালী যুগ

১৯৮১ সালে রঞ্জন মজুমদার পরিচালিত ‘সোনায় সোহাগা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে চিরঞ্জিতের রূপালী পর্দায় অভিষেক ঘটে। প্রথম ছবিতেই তিনি নিজের উপস্থিতি জানান দেন। এরপর আর তাঁকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে স্বপন সাহা, অঞ্জন চৌধুরী এবং প্রভাত রায়ের মতো পরিচালকদের সাথে জুটি বেঁধে তিনি একের পর এক ব্লকবাস্টার হিট ছবি উপহার দেন।

বাণিজ্যিক সিনেমার আইকন: চিরঞ্জিত কেবল একজন নায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন তৎকালীন দর্শকদের পালস বা নাড়ি বুঝতে পারা একজন অভিনেতা। ১৯৮৪ সালের ‘শত্রু’ সিনেমাটি তাঁর ক্যারিয়ারকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। রাগী, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী এবং মারকুটে পুলিশ অফিসারের চরিত্রে তাঁর অভিনয় টলিউডে অ্যাকশন ধারার এক নতুন যুগের সূচনা করে। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে ‘বেদের মেয়ে জোসনা’-র মতো রেকর্ডভাঙা সিনেমাতেও তাঁর অভিনয় বাংলার আপামর জনতার হৃদয়ে জায়গা করে নেয়।

তিনি উманаথ ভট্টাচার্য, মানু সেন, গুরু বাগচী, অজিত গঙ্গোপাধ্যায়, অনুপ সেনগুপ্ত, রাম মুখোপাধ্যায়, দুলাল ভৌমিক সহ তৎকালীন টলিউডের প্রায় সমস্ত প্রথম সারির পরিচালকদের সাথে কাজ করে শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।

চিরঞ্জিত চক্রবর্তী
চিরঞ্জিত চক্রবর্তী

ক্যামেরার পেছনে রূপকার: পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার চিরঞ্জিত

চিরঞ্জিতের প্রতিভার সবচেয়ে বড় দিক হলো, তিনি নিজেকে শুধু ক্যামেরার সামনে অভিনয়ে আটকে রাখেননি। তিনি একজন অত্যন্ত সফল চলচ্চিত্র পরিচালক এবং গল্পকার। নিজের কাহিনী ও চিত্রনাট্য অবলম্বনে তিনি মোট আটটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন। এই পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর একটি অনন্য রেকর্ড রয়েছে—নিজের পরিচালনায় নির্মিত সবকটি ছবিতেই তিনি নাম ভূমিকায় (Title Role) অভিনয় করেছেন।

সফল পরিচালক হিসেবে চিরঞ্জিতের কিছু মাইলফলক:
  • মর্যাদা (১৯৮৯): পরিচালক হিসেবে তাঁর এই ছবি বিপুল সমাদর পায় এবং বক্স অফিসে দারুণ সফল হয়।
  • কেঁচো খুঁড়তে কেউটে (১৯৯৫): এটি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম সেরা বুদ্ধিবৃত্তিক বাণিজ্যিক কমেডি-ড্রামা হিসেবে গণ্য করা হয়। এর সংলাপ এবং দৃশ্য নির্মাণ আজও দর্শকদের আনন্দ দেয়।
  • সংসার সংগ্রাম (১৯৯৫) ও বসতির মেয়ে রাধা (২০০০): এই ছবি দুটি মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের আবেগ ছুঁয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল এবং বিশাল আর্থিক সাফল্য লাভ করেছিল।

অন্যান্য পরিচালকদের জন্যও তিনি লেখনী ধরেছেন। আনন্দম পরিচালিত ‘সিঁদুর’ (১৯৯১) ও মুরারী চক্রবর্তী পরিচালিত ‘শুভলগ্ন’ (১৯৯৯) ছবির চিত্রনাট্য এবং স্বপন সাহা পরিচালিত ‘মায়ের দিব্যি’ (১৯৯৮) ছবির গল্প ও চিত্রনাট্য চিরঞ্জিতের নিজস্ব সৃষ্টি।

চিরঞ্জিত চক্রবর্তী
চিরঞ্জিত চক্রবর্তী

বহুমাত্রিক মিডিয়া ব্যক্তিত্ব: সংবাদ পাঠ থেকে যাত্রামঞ্চ

চিরঞ্জিত চক্রবর্তীকে কোনো একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে বেঁধে রাখা অসম্ভব। চলচ্চিত্র ছাড়াও মিডিয়ার অন্যান্য ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশাল:

  • সংবাদ পাঠ ও দূরদর্শন: ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে দূরদর্শনে (Doordarshan) তাঁর সংবাদ পাঠের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ও বাচনভঙ্গি দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল।
  • থিয়েটার ও নাটক: কলকাতার ঐতিহ্যবাহী স্টার থিয়েটারে তাঁর নিজস্ব লেখা ও নির্দেশনায় একাধিক নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে, যা থিয়েটার জগতে তাঁর গভীর মননশীলতার পরিচয় দেয়।
  • টেলিভিশন ও যাত্রা: নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে টেলিভিশনের মেগা ধারাবাহিকেও তিনি দাপটের সাথে কাজ করেছেন। একই সাথে বাংলার লোকসংস্কৃতির অন্যতম অঙ্গ ‘যাত্রাভিনয়’-এ তাঁর উপস্থিতি জেলাগুলোতে উপচে পড়া ভিড় তৈরি করত।

 

চিরঞ্জিত চক্রবর্তী
চিরঞ্জিত চক্রবর্তী

 

রাজনীতির নতুন ইনিংস: জনপ্রতিনিধি হিসেবে নতুন জীবন

অভিনয় ও পরিচালনার দীর্ঘ ইনিংসের পর চিরঞ্জিত চক্রবর্তী জনসেবার উদ্দেশ্যে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তিনি ভারতের সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) দলে যোগ দেন। ২০১১ সালের ঐতিহাসিক পরিবর্তনের নির্বাচনে তিনি বারাসত বিধানসভা কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য (MLA) নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৬ এবং ২০২১ সালের নির্বাচনেও বারাসতের মানুষ তাঁর ওপর আস্থা রাখেন এবং তিনি বিপুল ভোটে পুনর্নির্বাচিত হন। একজন জনপ্রিয় তারকা হওয়া সত্ত্বেও এলাকার সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে থেকে তিনি নিজেকে একজন সফল জনপ্রতিনিধি হিসেবেও প্রমাণ করেছেন।

চিরঞ্জিত চক্রবর্তী
চিরঞ্জিত চক্রবর্তী

একনজরে চিরঞ্জিত চক্রবর্তীর সমৃদ্ধ চলচ্চিত্র পঞ্জি (১৯৮১ – ২০০২)

নিচে চিরঞ্জিত চক্রবর্তীর অভিনয় জীবনের সোনালী অধ্যায়ের (১৯৮১ থেকে ২০০২ পর্যন্ত) ছবির একটি কালানুক্রমিক তালিকা দেওয়া হলো, যা তাঁর কাজের বিশালতার প্রমাণ দেয়:

সালঅভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র সমূহ
১৯৮১সোনায় সোহাগা (প্রথম চলচ্চিত্র)
১৯৮২সন্ধান, ছুট, প্রফুল্ল
১৯৮৩অশ্রীলতার দায়ে, দিন যায়
১৯৮৪সমর্পিতা, শত্রু (ক্যারিয়ার ব্রেকিং অ্যাকশন ছবি)
১৯৮৫সোনার संसार, অন্তরালে, হরিশ্চন্দ্র শৈব্যা
১৯৮৬প্রেম ও পাপ, আর্তনাদ, জীবন, মধুময়, অমরকণ্টক
১৯৮৭গায়ক, প্রতিকার, মৌনমুখর, পাপপুণ্য
১৯৮৮বোবা সানাই, হীরের শিরুল, আঘাত, প্রতীক
১৯৮৯শত্রুপক্ষ, অগ্নিকৃষ্ণা, তুফান, নিশিবধূ, মর্যাদা (পরিচালিত ছবি), মহাপীঠ তারাপীঠ, আশা
১৯৯০পাপী, ঘরের বৌ, জোয়ার ভাটা
১৯৯১বেদের মেয়ে জোসনা (ঐতিহাসিক ব্লকবাস্টার), সিঁদুর (চিত্রনাট্যকার হিসেবে)
১৯৯২পিতৃঋণ, রক্তে লেখা, পেন্নাম কলকাতা, শয়তান, वेदেনীর প্রেম
১৯৯৩মানসম্মান, সম্পর্ক, শক্তি, কন্যাদান, তোমার রক্তে আমার সোহাগ, শঙ্কা, ঘর সংসার
১৯৯৪অতিক্রম, রক্ত নদীর ধারা, দাঙ্গা, বিশ্বাস অবিশ্বাসের খেলা, ফিরিয়ে দাও, লাল পান বিবি
১৯৯৫কেঁচো খুঁড়তে কেউটে (পরিচালিত ও অভিনীত), সংসার সংগ্রাম (পরিচালিত), প্রেমসংঘাত, নাগিন কন্যা, আবির্ভাব, জীবন যোদ্ধা, মশাল, রাখাল রাজা
১৯৯৬ভাই আমার ভাই, জয় বিজয়, ত্রিধারা, বেয়াদপ, ভয়
১৯৯৭নিষ্পাপ আসামী, চন্দ্রগ্রহণ, সবার উপরে মা, জীবন যৌবন, যোদ্ধা, পিতা-مাতা-সন্তান, সেদিন চৈত্রমাস
১৯৯৮লোলা লুসি, মায়ের দিব্যি (গল্প ও চিত্রনাট্য)
২০০০রূপসী দোহাই তোমার, বসতির মেয়ে রাধা (পরিচালিত ও অভিনীত)
২০০১বাড়িওয়ালী (ঋতুপর্ণ ঘোষ পরিচালিত সমাদৃত চলচ্চিত্র)
২০০২মানুষ অমানুষ
চিরঞ্জিত চক্রবর্তী
চিরঞ্জিত চক্রবর্তী

মূল বিষয়গুলো একনজরে (Key Takeaways)

  • প্রকৃত নাম ও হেরিটেজ: আসল নাম দীপক চক্রবর্তী। প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট শৈল চক্রবর্তীর পুত্র হওয়ায় জন্মসূত্রেই শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী।
  • ঝুঁকি নেওয়ার সাহস: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া মাঝপথে ছেড়ে শিল্পকে জীবনসঙ্গী করা।
  • অনন্য রেকর্ড: আটটি ছবি পরিচালনা করেছেন এবং প্রত্যেকটিতেই নিজে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে বাণিজ্যিক সফলতা এনেছেন।
  • অল-রাউন্ডার: রুপোলি পর্দার বাইরেও দূরদর্শনের নিউজ রিডার, মঞ্চের নাট্যকার-নির্দেশক এবং সফল যাত্রা অভিনেতা।
  • জননেতা: টলিউডের গ্ল্যামার জগত থেকে বেরিয়ে বারাসতের বিধায়ক হিসেবে তিন মেয়াদে রাজনীতি ও জনসেবায় সফল নেতৃত্ব।

চিরঞ্জিত চক্রবর্তী টলিউডের এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি কেবল সময়ের স্রোতে ভেসে যাননি, বরং নিজের শর্তে সিনেমার ধারা তৈরি করেছেন। তাঁর হাত ধরেই বাঙালি দর্শক পেয়েছে রোমান্স আর অ্যাকশনের এক চমৎকার ভারসাম্য। রূপোলি পর্দা থেকে বিধানসভা—সব মাঠেই ছক্কা হাঁকানো এই চিরসবুজ নায়ক আজও বাঙালির বিনোদন ও স্মৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

    মন্তব্য করুন

    আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।